শনিবার
রাত সাড়ে ১০টা। মতিঝিল নটর ডেম কলেজের সামনে পুলিশের চেক পোস্ট। কালভার্ট
রোডের মুখ থেকে কলেজের সামনে পুলিশবক্স পর্যন্ত ১০-১২ জন পুলিশ সদস্য
রয়েছেন। শাপলা চত্বর থেকে একটি রিকশায় করে বাসায় ফিরছিলেন শাহজাহানপুরের
বাসিন্দা চাকরিজীবী ফরিদ উদ্দিন। চেক পোস্টের কাছে আসতেই তাকে দাড় করানো
হলো। রিকশার যাত্রী ফরিদ উদ্দিন নামতেই পুলিশ তার দেহ তল্লাশি শুরু করল।
তল্লাশির প্রথমে তার মানিব্যাগ বের করে নেয় এক পুলিশ। ব্যাগটি বেশ কিছু
সময় ঘাঁটাঘাঁট...ি
করতে থাকেন তিনি । অপর একজন পুলিশ তার কোমর, প্যান্টের পকেট, শার্টের পকেট
ও সাথে থাকা একটি ফাইল তল্লাশি করতে শুরু করলেন। একপর্যায়ে শুরু হলো
প্রশ্নবাণ। কোথা থেকে এসেছেন, কেন গিয়েছিলেন, এত রাত হলো কেন ইত্যাদি।
প্রায় পাঁচ-সাত মিনিট পর ওই যাত্রীকে ছেড়ে দেয়া হলো। কিছু দূর গিয়ে ওই
যাত্রী তার মানিব্যাগে খুলে দেখেন তার প্রায় ৭০০ টাকা নেই। তল্লাশির আগে
যেখানে ৫০০ টাকার একটি ও ১০০ টাকার তিনটি নোট ছিল। এ ছাড়া দশ, বিশ ও ৫০
টাকার কয়েকটি নোট ছিল। চেক পোস্ট শেষে মানিব্যাগ তল্লাশি করে দেখেন
মানিব্যাগে ৫০০ টাকা ও ১০০ টাকার দু’টি নোট নেই। কথাগুলো বলছিলেন ফরিদ
উদ্দিন। তিনি বলেন, টাকা না দেখে তার বুঝতে আর বাকি থাকলো না কখন কোথায় এ
ঘটনা ঘটল। একই অভিযোগ করলেন নিউ মার্কেটের এক দোকান কর্মচারী খালেদ রেজা।
তিনি বলেন, টিকাটুলি চেক পোস্ট থেকে জোর করে তার ৮০০ টাকা নিয়ে গেছে
পুলিশ। তিনি বলেন, ঈদের বাজার। দোকানে অনেক কেনাবেচা হচ্ছে। তাই গভীর রাতে
বাসায় ফিরতে হয়। গত শনিবার রাত ১টায় তিন সহকর্মী একটি রিকশায় করে
দয়াগঞ্জের বাসায় ফিরছিলেন। হঠাৎ দয়াগঞ্জ পুলিশ চেকপোস্টে তাদের রিকশা
থেকে নামানো হয়। এ সময় পুলিশ তিনজনেরই দেহ তল্লাশি শুরু করে। তল্লাশির
শুরুতেই পুলিশ তাদের মানিক ব্যাগ তিনটি নিয়ে আলাদা এক জায়গায় গিয়ে
তল্লাশি চালায়। আর তাদের তিনজনকে এক জায়গায় রেখে অন্য পুলিশ সদস্যরা
তল্লাশি চালায় এবং প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ফেলে। তিনি বলেন, পাঁচ-সাত
মিনিট পর মানিব্যাগ ফেরত দিয়ে তাদের বলতে থাকে, ‘তাড়াতাড়ি এলাকা ছাড়,
না হলে থানায় নিয়ে যাব। এ সময় খালেদ তার মানিব্যাগ দেখতে গেলে পুলিশ
বলে, ‘এই ব্যাটা দৌড়া। সাহস কত আবার দাঁড়ায় আছে’। পরে কিছু দুর গিয়ে
দেখা যায়, মানিব্যাগে ৮০০ টাকা নেই। অন্য দু’জনের মানিব্যাগে টাকা কম
থাকায় সেখান থেকে কিছু নেয়নি। এভাবেই চলছে রাজধানীতে পুলিশের চেক পোস্ট।
পুলিশ সূত্রমতে, ঈদকে সামনে রেখে নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশের বিভিন্ন
কর্মসূচির মধ্যে চেক পোস্ট ছিল অন্যতম। রোজার মাঝামাঝি থেকে নিয়মিত চেক
পোস্টের পাশাপাশি বিশেষ চেক পোস্টও বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ জন্য রাজধানীর
গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়, শপিংমল, মার্কেট, ট্রেন, বাস ও লঞ্চ টার্মিনালকে
লক্ষ্য করে বিভিন্ন এলাকায় চেক পোস্ট বসিয়েছে পুলিশ। বিশেষ করে রাত ৮টার
পর থেকেই শুরু হয় এসব চেকপোস্টের কার্যক্রম। তবে দিনের বেলায়ও হয়ে থাকে।
ওই সূত্রের দাবি, চেক পোস্টের কারণে রাজধানীতে ছিনতাই, অজ্ঞান পার্টি, মলম
পার্টি, টানা পার্টির দৌরাত্ম্য কমে গেছে। সূত্র জানায়, পুলিশ তাদের
সরাসরি না ধরতে পারলেও চেক পোস্টের ভয়ে বা পুলিশের উপস্থিতির কারণে অপরাধ
সংঘটিত করতে পারছে না। ওই সূত্র জানায়, অপরাধারীরা বর্তমানে মানিব্যাগের
মাধ্যমে ইয়াবা বহন করে থাকে। ইয়াবা ট্যাবলেটগুলো আকারে ছোট হওয়ায়
সেগুলো মানিব্যাগের চিপায়-চাপায় রেখে দেয়। যার কারণে পুলিশ মাঝে মধ্যেই
মানিব্যাগ তল্লাশি করে থাকে। তবে পথচারীরা অভিযোগ করছেন, এসব চেক পোস্টে
মানুষ বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন,
চেকপোস্টগুলোতে কিছু পুলিশ সদস্য রয়েছেন যাদের আচরণই খারাপ। কার সাথে
কিভাবে আচরণ করা উচিত সেই সৌজন্যবোধটুকুও নেই তাদের মাঝে। কোনো কোনো পুলিশ
রয়েছে যারা তল্লাশি করে কিছু না পেলে বা টাকা পয়সা না রাখতে পারলে
ক্ষিপ্ত হয়ে যান। সামান্য কিছু জানতে চাইলেও গালি-গালাজ করতে থাকে। এ
ব্যাপারে ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, নগরবাসীর নিরাপত্তা
নিশ্চিত করতে রাজধানীতে পুলিশের চেক পোস্ট বৃদ্ধি করা হয়েছে। যার কারণে
ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধীদের দৌরাত্ম্য নেই বললেই চলে। তবে রাস্তায় গাড়ি
দাঁড় করানো বা চলতি পথে পথচারীদের দাঁড় করিয়ে তল্লাশি করায় নগরবাসীর
কিছুটা অসুবিধা হতে পারে। তিনি বলেন, চেক পোস্টে কোনো পুলিশ সদস্য সাধারণ
মানুষের সাথে অসাদাচরণ করলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করলে
অব্যশই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

No comments:
Post a Comment