রাজধানীর কাপ্তানবাজার এলাকার হোটেল শৈবাল আবাসিকে বসে কিশোরী মেয়েদের এই হাট। ব্যাপক অনুসন্ধানে জানা গেছে, সেখানে নারী ও শিশু পাচারকারী একটি সংঘবদ্ধ চক্র দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরী মেয়েদের নিয়ে আসে। প্রেমের ফাঁদে ফেলে, বিয়ের কথা বলে, বেশি বেতনে ভাল চাকরির আশ্বাস, মডেল বানিয়ে সিনেমার পর্দায় অভিনয়ের সুযোগ করে দেয়া, বিদেশে চাকরির প্রলোভনসহ বিভিন্ন ফন্দি-ফিকির করে শিশু-কিশোরীদের সংগ্রহ করা হয়। এরপর তাদের উপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। এমনি নির্যাতনের শিকার শিশু মলিনা (১৩) ও প্রিয়া (১৪)।
এদের মতো প্রাপ্ত-অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের শৈবাল হোটেলে এনে প্রথমে পাচারকারীরা নিজেরা গণধর্ষণ করে। এরপর তাদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়। সেখানে কেউ হিংস্র হয়ে উঠলে আটক মেয়েদের অশ্লীল ছবি ইন্টারনেটসহ প্রচার মাধ্যমে ছেড়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে জিম্মায় রাখে পাচারকারীরা।
এভাবেই সংঘবদ্ধ চক্রটি কিশোরীদের তাদের আদেশ-নির্দেশের ক্রীড়নক বানিয়ে অসামাজিক কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। এখান থেকে কিশোরীদের বিভিন্ন ফ্ল্যাট বাসা, আবাসিক হোটেল, পতিতালয় এবং কৌশলে বিদেশে পাচার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, মলিনা ও প্রিয়া নামের দুই শিশু-কিশোরীসহ শতাধিক তরুণীকে অপহরণপূর্বক আবাসিক হোটেল, ফ্ল্যাট বাসা এবং পতিতালয়ে বন্দি রেখে দেহ ব্যবসায় বাধ্য করার খবর জেনেও ওয়ারী থানা পুলিশ তাদেরকে উদ্ধার করছে না।
মানবাধিকার কর্মীরা বিস্তারিত ঘটনা থানাকে জানালেও পাত্তা দেয়নি পুলিশ। পরে বিভিন্ন আবেদনের প্রেক্ষিতে একটি সংগঠন ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে ফ্ল্যাট বাসা ও আবাসিক হোটেলে আটকে রাখাসহ জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি করানোর সন্ধান পায়। তারা শিশু মলিনা ও প্রিয়াসহ আটক অন্য কিশোরীদের উদ্ধারের ব্যাপারে থানা পুলিশের সহায়তা চায়। এ ব্যাপারে হিউম্যান রিসোর্স এন্ড হেল্থ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জনস্বার্থে ওয়ারী থানাসহ ডিএমপি’র কয়েকটি থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ তাতে অনীহা প্রকাশ করে।
তাই অভিযোগ আকারে আবেদনপত্রের মাধ্যমে ডাকযোগে পুলিশের উর্ধ্বতন মহলকে বিষয়টি অবহিত করা হয় বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। তা সত্ত্বেও ওয়ারী থানা পুলিশ আটক এরকম শতাধিক প্রাপ্ত-অপ্রাপ্ত মেয়েদের উদ্ধারে কোন পদক্ষেপ নিতে সম্মত হয়নি। বাধ্য হয়ে হিউম্যান রিসোর্স এন্ড হেল্থ ফাউন্ডেশন স্ব-উদ্যোগে সংস্থার পক্ষে কো-অর্ডিনেটর নুরুল ইসলাম চৌধুরীকে বাদী করে দেড় শতাধিক নারী পাচারকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ঢাকা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের শরণাপন্ন হয়।
তারপরও বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি ওয়ারী থানা পুলিশ। পরে ৭ আগস্ট ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩ এর বিচারক এস. এম. রেজানুর রহমানের (জেলা জজ) আদালতে মানবপাচার আইনে পিটিশন মামলা (মামলা নং- ১৪২/২০১৩) রুজু করলে আদালত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ওয়ারী থানাকে নির্দেশ দেন। ডিসপাস স্মারক নং-২০১২, তারিখ : ১২/০৮/১৩ ইং। তা সত্ত্বেও পুলিশ মামলায় উল্লেখিত ভিকটিমদের উদ্ধার ও পাচারকারীদের গ্রেফতারের ব্যাপারে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
মানবাধিকার সংগঠনটির অনুসন্ধান টিম জানতে পেরেছে পতিতালয়, আবাসিক হোটেল, ফ্ল্যাটবাসায় নারী পাচারকারীদের জিম্মায় থাকা মলিনা ও প্রিয়াসহ শিশু-কিশোরীদের নানা বর্বরতা চালানোর মাধ্যমে তাদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হচ্ছে। তারা যেন কোনভাবে সেখান থেকে পালাতে না পারে এজন্য মলিনার মাথার চুল কেটে ন্যাড়া করে ও অন্যান্যদের প্রায় নগ্ন অবস্থায় রাখা হচ্ছে। গেটের তালা লাগানো থাকছে সর্বক্ষণ।
অনুসন্ধান টিমের সদস্যরা কিশোরীদের আটক অবস্থার দৃশ্যটি কৌশলে ক্যামেরায় ধারণ করতে সক্ষম হন। এদিকে, মামলা হওয়ার পর থেকেই বাদী পক্ষের একাধিক কর্মকর্তা বার বার ওয়ারী থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহা ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোক্তারের কাছে গিয়ে অন্যান্য থানা এলাকায় আটক ভিকটিমদের উদ্ধারের জন্য অধিযাচরন পত্র (রিক্যুইজিশন পত্র) চাওয়া হলেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এমন অবস্থায় ওইসব শিশু-কিশোরীদের বন্দি দশা থেকে মুক্ত এবং নারী পাচারকারীদের গ্রেপ্তার করতে উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের জরুরি পদক্ষেপ কামনা করেছে হিউম্যান রিসোর্স এন্ড হেল্থ ফাউন্ডেশন।
No comments:
Post a Comment